কুরবানীর পশু জবাই করার দোয়া ও কোরবানির নিয়ম জানুন

কুরবানীর পশু জবাই করার দোয়া ও কোরবানির নিয়ম জানুনঃ- কোরবানির ঈদ মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব গুলোর মধ্যে একটি। উৎসবের এই দিনটিকে ঘিরে মুসলমানদের থাকে নানারকম পরিকল্পনা। যেহেতু এই ঈদে প্রতিটি মুসলমানই কমবেশি কোরবানি দিয়ে থাকে, তাই কোরবানির নিয়ম সম্পর্কে সবার মনেই কম বেশি আগ্রহ কাজ করে। আজকের আর্টিকেলে আমি আপনাদেরকে জানাবো কুরবানীর মাসায়েল, কুরবানী করার দোয়া, কোরবানির নিয়ম, কোরবানির গরু জবাই করার দোয়া সম্পর্কে। আশা করছি আজকের লেখা পড়লে আপনারা  কোরবানির নিয়ম সম্পর্কে অনেক কিছুই জানতে পারবেন। 

কোরবানীর-পশু-জবাই-করার-দোয়া-নিয়ম
কোরবানীর-পশু-জবাই-করার-দোয়া-নিয়ম

 

কোরবানির ইসলামিক ইতিহাস 

কোরবানির নিয়ম সম্পর্কে জানার আগে চলুন আমরা কোরবানি সম্পর্কিত ইতিহাস সম্পর্কে একটু জেনে আসি। মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের নবী হযরত ইব্রাহিম( আঃ) কে পরীক্ষা করার উদ্দেশ্যে স্বপ্নের মাধ্যমে তার নিজের প্রাণপ্রিয় পুত্রসন্তান হযরত ইসমাইল (আঃ) কে কোরবানি করতে বলেছিলেন৷ এটি ছিলো নবীর জন্য আল্লাহ তা’আলার পক্ষ থেকে আসা একটি অত্যন্ত কঠিন পরীক্ষা। হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এ স্বপ্ন দেখার পর  তার পুত্রকে কোরবানি করতে যান।  তখন আল্লাহর আদেশে একটি দুম্বা কুরবানী হয়ে যায় এবং সেই থেকেই মুসলমানদের জন্য কোরবানির নিয়ম জেনে কোরবানি দেয়া শুরু হয়। 

কাদের জন্য কোরবানি করা ওয়াজিব?

প্রতিটি মুসলমান যাদের কাছে প্রয়োজনীয় নেসাবের অতিরিক্ত পরিমাণ সম্পদ বিদ্যমান রয়েছে, তাদের প্রত্যেকের জন্য কুরবানী করা ওয়াজিব। এক্ষেত্রে স্বর্ণ ও রুপার ক্ষেত্রে নেসাবের পরিমাণ হলো যথাক্রমে সাড়ে সাত ভরি ও সাড়ে বাহান্ন ভরি। এছাড়া টাকাপয়সা ও অন্যান্য বস্তু থাকলে সাড়ে বাহান্ন তোলা রূপার যে মূল্য তার সমান বা অতিরিক্ত থাকলেই ওই মুসলমানের জন্য কুরবানি করা ওয়াজিব। যাদের জন্য কোরবানি ওয়াজিব তাদের অবশ্যই কুরবানির সব নিয়ম মেনে কুরবানি দিতে হবে। 

কোরবানির নিয়ম 

এবার আসা যাক কোরবানির নিয়ম নিয়ে।  প্রতিবছরের জিলহজ মাসের দশ তারিখ সকাল বেলা থেকে  জিলহাজ মাসের বারো তারিখে সূর্য ডুবে যাওয়ার আগ পর্যন্ত  ইসলামী শরীয়তের সমস্ত নিয়মকানুন মেনে মহান আল্লাহ তাআলার কাছ থেকে সন্তুষ্টি ও করুনা লাভের উদ্দেশ্যে  পশু কোরবানি করা হয়।  

তবে জেনে রাখা ভাল, যেকোনো পশু কিন্তু কোরবানি দেয়া যায়না।কোরবানির জন্য নির্ধারিত পশুগুলো হচ্ছে একটি দুম্বা, একটি ছাগল অথবা একটি ভেড়া।  এছাড়াও কোনো মুসলমান চাইলে গরু-মহিষ বা উটের সাত ভাগের অন্তত এক ভাগ কোরবানি দিতে পারে। 

আশা করি নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন তাহলে একটি গরু অথবা মহিষ আপনারা সাতজন মিলে কুরবানী দিতে পারবেন। আপনারা নিশ্চয়ই সাতজন মিলে একটি গরু কিংবা মহিষ কোরবানি দিতে দেখেছেন। এভাবে কোরবানির নিয়ম হলো যতজন কোরবানি দেবেন তারা প্রত্যেকে কোরবানির পশুর সমান অংশীদার হিসেবে গ্রাহ্য হবেন। 

কোরবানির নিয়ম মেনে কোরবানির গরু জবাই করার পর অথবা অন্য কোন পশু জবাই করার পর যে পরিমাণ গোশত পাওয়া যাবে, সেটি কখনোই পুরোপুরি নিজে খাওয়া যাবেনা। বরং কিছু অংশ নিজের আত্মীয় স্বজনদের সাথে ভাগ করে খেতে হবে এবং কিছু অংশ আমাদের আশেপাশে যে গরিব দুঃখী মানুষ রয়েছে তাদের মধ্যে দান করে দিতে হবে। এক্ষেত্রে যে মুমিন যত বেশি গোশত গরিব দুঃখীদের মাঝে বিতরন করতে পারবেন, তার সওয়াব তত বেশি হবে। 

সব সময় মনে রাখবেন, পশু কোরবানি দেয়া ব্যতীত অন্য কোনভাবে কোরবানি দেয়া সম্ভব নয়। আপনারা চাইলে গরীবদের দান খয়রাত করতে পারেন অথবা যাকাত দিতে পারেন, কিন্তু তাতে কোরবানি আদায় হবে না বা কোরবানির মত সওয়াব পাওয়া সম্ভব হবে না। তবে যদি এমন হয় যে কোন ব্যক্তির কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে (যেমন দেশে না থাকা) নিজে কুরবানী দিতে অসমর্থ হন ,তাহলে তিনি অন্য কারো মাধ্যমে কুরবানী দিতে পারেন। তবে এক্ষেত্রে আসল কথা হচ্ছে, আপনি নিজে কোরবানি দিন অথবা অন্য কারো মাধ্যমে সম্পন্ন করুন ,কোরবানির নিয়ম জানা থাকা অত্যাবশ্যক। 

কোরবানির দোয়া ও পশু জবাই করার নিয়ম

এবার আসা যাক কোরবানির নিয়ত ও কুরবানী করার দোয়া সম্পর্কে। কোরবানির নিয়ত অবশ্যই শুদ্ধ হতে হবে। কারণ কোরবানির নিয়ত শুদ্ধ না হলে কখনোই সে কোরবানি থেকে পরিপূর্ন সাওয়াব পাওয়া সম্ভব হবে না। সব সময় মনে রাখতে হবে মহান আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি পাওয়ার জন্যই এ কোরবানি করা হচ্ছে। তাই নিয়ত শুদ্ধ রাখতে হবে এবং কোরবানির নিয়ম মেনে পশু কোরবানি করতে হবে। 

কোরবানির গরু জবাই অথবা অন্য কোন পশু জবাই নিজের হাতে করাই উত্তম। তবে নিজে না পারলে অন্য কাউকে দিয়েও করাতে পারবেন। কোরবানির দোয়া আরবি ভাষাতে হয়ে থাকে। এ কারণে যিনি কোরবানি দেবেন তাকে কোরবানির দোয়া আরবি ভাষায় জানতে হবে। অর্থাৎ কুরবানির নিয়ম ও কুরবানী করার দোয়া সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা রাখতে হবে।

এবার আসা যাক কুরবানীর পশু জবাই করার দোয়া ও গরু জবাই করার নিয়ম সম্পর্কে। যখন কোরবানির পশু জবাই করা হবে তখন শুরুতেই পশুকে কিবলামুখী করে শুইয়ে দিতে হবে। এরপর কুরবানী করার দোয়া পড়তে হবে। 

কোরবানির গরু জবাই করার দোয়া

ইন্নি ওয়াঝঝাহতু ওয়াঝহিয়া লিল্লাজি ফাতারাস সামাওয়াতি ওয়াল আরদা হানিফাও ওয়া মা আনা মিনাল মুশরিকিন। ইন্না সালাতি ওয়া নুসুকি ওয়া মাহইয়া ওয়া মামাতি লিল্লাহি রাব্বিল আলামিন। লা শারিকা লাহু ওয়া বি-জালিকা উমিরতু ওয়া আনা মিনাল মুসলিমিন। আল্লাহুম্মা মিনকা ও লাকা। 

এরপর বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার বলতে হবে এবং জবাই করা শুরু করতে হবে। এসময় এ কুরবানী করার দোয়া টি পড়তে হবে। 

আল্লাহুম্মা তাকাব্বালহু মিন্নি কামা তাকাব্বালতা মিন হাবিবিকা মুহাম্মাদিও ওয়া খালিলিকা ইবরাহিমা আলাইহিমাস সালাতা ওয়াস সালাম।

যদি নিজে কোরবানির গরু জবাই করেন তাহলে মিন্নি উচ্চারণ হবে। অন্যথায় মিন উচ্চারণ করতে হবে। 

কোরবানির শুদ্ধতা নিশ্চিত করার জন্য কোরবানির গরু জবাই করার নিয়ম হলো, জবাই করার সময় গরু বা কোরবানির পশুর কণ্ঠনালী ও খাদ্যনালীর দুইপাশের সর্বমোট চারটি রগ যেন কাটা হয় তা নিশ্চিত করতে হবে। কোরবানির গরু জবাই করার ক্ষেত্রে আরেকটি কোরবানির নিয়ম মনে রাখতে হবে। সেটি হলো ধারালো ছুরি ব্যবহার করতে হবে। এতে কোরবানির গরু বা পশু জবাই করার সময় সেটির কষ্ট কম হয়। এটিই হলো উৎকৃষ্ট গরু জবাই করার নিয়ম। 

আশা করি সবাই এখন কোরবানির নিয়ম সম্পর্কে বুঝতে পেরেছেন এবং কোরবানির পশু জবাই করার দোয়া সম্পর্কে আপনাদের আর কোনো সন্দেহ নেই। 

আরও পড়ুনঃ

সবচেয়ে কম দামে ফ্রিজ, ওয়ালটন ফ্রিজের দাম দেখুন

কুরবানীর মাসায়েল 

কোরবানির নিয়ত, কোরবানির নিয়ম, কোরবানির গরু জবাই করার দোয়া, গরু জবাই করার নিয়ম ইত্যাদি সম্পর্কে তো বিস্তারিতভাবে জানালাম। চলুন এবার জেনে নেয়া যাক কিছু কুরবানীর মাসায়েল সম্পর্কে। যারা উট কোরবানি করতে চান সে ক্ষেত্রে উট এর বয়স অন্ততপক্ষে পাঁচ বছর হতে হবে। গরু ও মহিষের ক্ষেত্রে দুই বছরের কম বয়সী কোন গরু মহিষ কোরবানি করা যাবে না। 

আর যারা ছাগল দুম্বার অথবা ভেড়া কোরবানি দিতে চান, সেক্ষেত্রে এগুলোর বয়স অন্তত এক বছর হতে হবে। তবে এক্ষেত্রে যদি ভেড়া ও দুম্বার বয়স অন্ততপক্ষে ৬ মাস হয় এবং এগুলো দেখতে স্বাস্থবান হওয়ার কারণে এক বছর বয়সের মত দেখতে লাগে, তাহলে সেগুলো দিয়ে কোরবানি দিতে পারবেন। 

যদি কোরবানির পশু অতিরিক্ত দুর্বল হয় যে জবাই করার স্থান পর্যন্ত হেঁটে যাওয়ার শক্তি না থাকে, তাহলে সেই পশু দিয়ে কুরবানী করা যাবেনা। কারণ তখন সে পশু রুগ্ন পশু হিসেবে ধরা হবে। এগুলোর পাশাপাশি কোরবানির পশু যদি অন্ধ হয়, ল্যাংড়া হয় এবং পশুর লেজ ও কানের বেশিরভাগ অংশই কাটা থাকে, তাহলে সে পশু কোরবানি করা যাবে না। 

কোরবানি করার পর কোরবানির গোশত, চর্বি ইত্যাদি কখনোই কারো কাছে বিক্রি করা যাবে না। যারা কোরবানির গরু জবাই করার কাজটি করে থাকেন তাদের কে পারিশ্রমিক দেওয়া যাবে, তবে কোরবানির পশুর কোন অংশ দিলে সেটিকে পারিশ্রমিক হিসেবে গণ্য করা যাবেনা। 

যদি এমন হয় যে কোন মৃত ব্যক্তি মারা যাওয়ার আগে কোরবানির জন্য ওসিয়ত করে রেখে গেছেন, তাহলে সেই মৃত ব্যক্তির নামে যখন কোরবানি দেওয়া হবে সেই কোরবানির পশুর গোশত নিজেরা খাওয়া যাবেনা, বরং সেই গোশত গরীবদের মাঝে বিতরন করে দিতে হবে।   

শেষ কথা 

এটুকুই ছিল কোরবানির নিয়ম সম্পর্কিত আজকের বিস্তারিত আলোচনা। আশা করি আপনারা কোরবানির নিয়ত, কুরবানীর পশু জবাই করার দোয়া, গরু জবাই করার নিয়মের পাশাপাশি কুরবানীর মাসায়েল সম্পর্কেও অবগত হয়েছেন। লেখাটি ভালো লাগলে সবার সাথে শেয়ার করতে ভুলবেননা! 

Leave a Comment

Your email address will not be published.

Scroll to Top